স্বর্ণের দাম পৌঁছতে পারে সাড়ে ৩ হাজার ডলারে

বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যে বিনিয়োগকারীদের দৃষ্টি আবারো স্বর্ণের দিকে।

বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যে বিনিয়োগকারীদের দৃষ্টি আবারো স্বর্ণের দিকে। বিশ্লেষকদের মতে, আগামী কয়েক মাসে স্বর্ণের দাম বেড়ে আউন্সপ্রতি ৩ হাজার ৫০০ ডলার পর্যন্ত পৌঁছতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র ও চীন বাণিজ্য উত্তেজনা, মন্দার শঙ্কা ও ডলারের দুর্বলতায় স্বর্ণ এখন সবচেয়ে আকর্ষণীয় নিরাপদ সম্পদে পরিণত হয়েছে। খবর দ্য ন্যাশনাল।

শুক্রবার স্বর্ণের দাম আউন্সপ্রতি ৩ হাজার ২৩৭ ডলারে পৌঁছায়, যা ইতিহাসে সর্বোচ্চ। গত বছরের ধারাবাহিক ঊর্ধ্বগতি ধরে রেখে চলতি বছরই এর দাম বেড়েছে প্রায় ২১ শতাংশ। দুর্বল ডলার, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের চাহিদা ও স্বর্ণভিত্তিক এক্সচেঞ্জ-ট্রেডেড ফান্ডে (ইটিএফ) বিনিয়োগ বৃদ্ধির কারণে এ ঊর্ধ্বগতি অব্যাহত আছে বলে জানিয়েছেন বিশ্লেষকরা।

সেঞ্চুরি ফাইন্যান্সিয়ালের চিফ ইনভেস্টমেন্ট অফিসার বিজয় ভালেচা বলেন, ‘স্বর্ণের এ ঊর্ধ্বগতি আগামী মাসগুলোয় অব্যাহত থাকতে পারে। আর দাম ৩ হাজার ৪০০ থেকে ৩ হাজার ৫০০ ডলার পর্যন্ত পৌঁছতে পারে।’

তিনি আরো বলেন, ‘এছাড়া মন্দার শঙ্কা বাড়তে থাকায় অনিশ্চিত অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে ডলার ক্রমাগত দুর্বল হচ্ছে। অন্যদিকে ইউরোর মান শক্তিশালী হচ্ছে। এ কারণে আপৎকালীন নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে আরো দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে ধাতুটি।’

গত শুক্রবার চীন যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি পণ্যে শুল্ক বাড়িয়ে ১২৫ শতাংশ করেছে, পাল্টা জবাবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চীনা পণ্যে শুল্ক ১৪৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়েছেন। এ পরিস্থিতি বিশ্ববাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করেছে। এতে বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ থেকে নিরাপদ আশ্রয়ে, অর্থাৎ স্বর্ণে ঝুঁকতে বাধ্য করেছে।

মার্চে স্বর্ণভিত্তিক ইটিএফে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ফান্ডগুলো মূল্যবান এ ধাতুতে ৬০০ কোটি ডলার (প্রায় ৬৭ টন) নতুন বিনিয়োগ করেছে। ইউরোপ ও এশিয়া অঞ্চল থেকে প্রায় ১০০ কোটি ডলার করে বিনিয়োগ হয়েছে।

সিটি ইনডেক্স ও ফরেক্স ডটকমের বিশ্লেষক ফাওয়াদ রাজাকজাদা বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে বাণিজ্য চুক্তির দূরত্ব বাড়ছে, যা বর্তমানে বৈশ্বিক ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদগুলোর জন্য সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা।’

তবে কিছু বিশ্লেষক মনে করছেন, বর্তমানে স্বর্ণের দাম কিছুটা চড়া হলেও ঝুঁকি কমলে দাম কমতে পারে। তবে স্যাকসো ব্যাংক পূর্বাভাসে জানিয়েছে, চলতি বছর স্বর্ণের দাম অন্তত ৩ হাজার ৩০০ ডলারে পৌঁছবে।

ব্যাংকটির কমোডিটি কৌশল প্রধান ওলে হ্যানসেন বলেন, ‘বিশ্বজুড়ে মন্দা ও মূল্যস্ফীতির সমন্বয়ে তৈরি ‘স্ট্যাগফ্লেশন’ পরিস্থিতি, ডলারের দুর্বলতা ও ফেডারেল রিজার্ভের সম্ভাব্য হার কমানোর সিদ্ধান্ত—সব মিলিয়ে স্বর্ণের মূল্যবৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে।’ উল্লেখ্য, স্ট্যাগফ্লেশন হচ্ছে এমন এক পরিস্থিতি, যেখানে নিম্ন কর্মসংস্থান, প্রবৃদ্ধি ও ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতির সংমিশ্রণ ঘটে।

ভালেচা বলেন, ‘অতীতের তুলনায় এবারের স্বর্ণের মূল্যবৃদ্ধি খুব বেশি বা দীর্ঘস্থায়ী নয়। কারণ ১৯৭১-২০২০ সালের মধ্যে যখনই স্বর্ণের দাম এভাবে বেড়েছিল, তখন গড়ে প্রায় ২৪২ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছিল। অর্থাৎ, অতীতে এমন পরিস্থিতিতে স্বর্ণের দাম আরো অনেক বেশি বেড়েছে। ২০২২ সাল থেকে শুরু হওয়া বর্তমান ঊর্ধ্বগতিতে এখনো মাত্র ১০০ শতাংশ বেড়েছে। তাই বর্তমান পরিস্থিতি এখনো মাঝপথে আছে বলা যায়।’

বিশ্লেষকরা বলছেন, যতক্ষণ না বৈশ্বিক উত্তেজনা কমছে, ততক্ষণ পর্যন্ত বিনিয়োগের ক্ষেত্রে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে স্বর্ণ থাকবে বিনিয়োগকারীদের আস্থার প্রতীক।

আরও